০৫:৪১ অপরাহ্ন, আগস্ট ২৭, ২০১৬ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৫:৪৫ অপরাহ্ন, আগস্ট ২৭, ২০১৬

চার বছরের বড় কিন্তু তুই-তুমি সম্পর্ক

Share this with

Copy this link
নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু

নূর ভাইকে প্রথম দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার সময়। বাংলা একাডেমিতে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিল, নূর ভাই সেটার দায়িত্বে ছিল। ঘনিষ্ঠতা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরপর। মুক্তিযুদ্ধের পর যখন আমরা আমাদের সঙ্কট আর সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলছিলাম এমন আড্ডায় আমাদের সঙ্গে নূর ভাই যোগ দেয়। যদিও আমাদের যুদ্ধের এলাকা ছিল আলাদা। আমার ছিল ঢাকা, নূর ভাইয়ের রংপুর। আমাদের মিলনের কেন্দ্রস্থল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন, মধুর ক্যান্টিনসহ অনেক জায়গায় আমরা একসঙ্গে অনেক আড্ডা দিয়েছি। আমি যখন ম. হামিদের সঙ্গে নাট্যচক্রে নাটক করি ১৯৭২ সালে, তখন আমাদের সাংস্কৃতিক বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। আমরা একটা জায়গায় একমাত্র সাম্যের যে সংস্কৃতি সেটা মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে ভেবেছিলাম অর্জন করব। সেটা করতে গেলে যে আমাদের বড় রকমের একটা কালচারাল মুভমেন্ট দরকার সেটার কারণে নূর ভাই নাগরিক আর আমরা ঢাকা থিয়েটার করলাম। এতে করে আমাদের কিছু আসে-যায় না। আমাদের বন্ধুত্ব অটুট থাকল। আমাদের ভাবনাচিন্তা ও উদ্দেশ্য সবকিছু এক। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর যে মুভমেন্ট গড়ে উঠল সেখানে নূর ভাইসহ অনেকের মুভমেন্ট একই ছিল। প্রথম কিন্তু আমরা ১৯৭৯ সালে ঢাকা নাট্য উৎসব করলাম। তখন তৎকালীন শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক একটা বিরূপ আচরণ করেছিলেন নাটক নিয়ে। সেখানে আমরা নাটক না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। সেটাই আমাদের প্রথম বিদ্রোহ নাটক নিয়ে। আমরা বলেছিলাম, সরকারকে দাসখত দিয়ে নাটক করতে পারব না। পরে মহিলা সমিতিতে একটা নাট্য উৎসব করলাম। আমি আহ্বায়ক। নূর ভাই আর আবদুল কাদের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিল। এই প্রথম একসঙ্গে আমাদের সাকসেসফুল কিছু একটা হলো। তারপর নাট্য ফেডারেশনের সঙ্গে আমরা জড়িত হলাম। রামেন্দু মজুমদার, আমি, আতাউর রহমান, মামুনুর রশীদ, নূর ভাই সবাই একসঙ্গে ছিলাম এখানে।
নূর ভাইয়ের প্রথম টেলিভিশন ধারাবাহিক অভিনীত নাটক সেলিম আল দীনের লেখা আমার পরিচালনায় ‘লাল মাটি কালো ধোঁয়া’ করেছে। নূর ভাই মূল অভিনেতা ছিল। তখন পর্যন্ত নূর ভাই তেমন পরিচিত না টেলিভিশনে। এটাই তার প্রথম বড় চরিত্রে অভিনয় করা।
নূর ভাই বন্ধু হিসেবে খুব ভালো। মানুষ হিসেবে সহমর্মিতা রয়েছে। বন্ধুদের প্রতি, সাধারণ মানুষের প্রতি। নূর ভাইয়ের হাত ধরে জীবনের অনেক কিছু শিখেছি। নূর ভাই তখন চাকরি করত রাশান এম্বাসিতে। আড্ডা মারার প্রবণতা ছিল অনেক। বকশীবাজারে নূর ভাইদের একটা বাড়ি ছিল, এটা ’৭৪ সালের কথা বলছি। সেখানে একটা লম্বা বারান্দা ছিল। আমি, নূর ভাই, রাইসুল ইসলাম আসাদ সেখানে সারারাত মাদুর পেতে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দিতাম। এমন অসাধারণ অনেক স্মৃতি রয়েছে। আন্দোলনের অনেক স্মৃতি রয়েছে। ’৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান আমরা একসঙ্গে করেছি। এই সময় যখন আমরা পালিয়েছিলাম তখন একসঙ্গে ছিলাম। তখন অনেক সঙ্কটের কথা, সম্ভাবনার কথা ব্যক্তিগত অনেক সাফল্য-ব্যর্থতা, রাগ-অনুরাগের কথা বলেছি। গণতন্ত্র অভিযাত্রার সময় আমি নূর ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকা থেকে কক্সবাজার, রংপুর একসঙ্গে ছিলাম। এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নূর ভাই পালন করেছিল। দুজনের বন্ধুত্ব বুদ্ধির কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটা আন্দোলনে আমরা একসঙ্গে থাকার চেষ্টা করেছি। নূর ভাই টাকা-পয়সার ব্যাপারে খুব দিল-দরিয়া। আমরা যখন চাকরি-বাকরি কিছু করি না তখন আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছে। আমাদের আরেক বন্ধু ছিল তখন শফিকুর রহমান। আমাদের অনেক খাওয়াত। এমন হয়েছে এক জায়গায় বসে আছি বিল দিতে পারছি না, নূর ভাই এসে বিল দিয়ে দিয়েছে। আমার চার বছরের বড় কিন্তু তুই-তুমি সম্পর্ক।
বাচিক অভিনয়ে বাংলাদেশে সেরা অভিনেতা। তার মতো আর কেউ নেই। মঞ্চে তার সপ্রতিভ অভিনয়, ন্যাচারাল অভিনয়, যা দেখার জন্য বাঙালি অপেক্ষা করেছিল নূর ভাই সেটা দেখিয়েছে। অনেক চমৎকারভাবে নিজেকে দেখাতে পারে। মঞ্চে যখন ঢুকছে তখন মনে হচ্ছে না লোকটা কিছু করবে। কিন্তু তিন-চার মিনিট পর কিছু একটা তৈরি হচ্ছে। একটা সময় আর তার থেকে চোখ সরানো যাচ্ছে না। সৌম্য দর্শন কণ্ঠস্বর অসাধারণ। চরিত্র বিশ্লেষণের ক্ষমতা অসাধারণ। এর ফলে যখন যে চরিত্র করছে সেটাই হয়ে উঠছে। যখন লাল মাটি কালো ধোঁয়া ও গ্রামের চরিত্র করছে তখন আলাদা আবার মির্জা যখন করছে অন্যরকম। নূরলদিনের সারাজীবন নাটকে আব্বাসের চরিত্রে আবার আলাদা। কী সুন্দর তাল-লয়-ছন্দ ঠিক রেখে অভিনয় করছে। সবাইকে কেমন ঘিরে ফেলে অভিনয় দিয়ে। গ্যালিলিও নাটকে নজরকাড়া অভিনয় অসাধারণ। ছোট্ট একটু হাসিও নজর কাড়ে দর্শকদের। নূর ভাইয়ের মুভমেন্ট অসাধারণ।
এখন ব্যস্ততার কারণে মঞ্চে অভিনয় করতে পারে না। তার ফলে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের মঞ্চ। একসময় আমরা বকা দেব, কারণ যতটা আমাদের দেয়া উচিত ছিল ততটা সে দেয়নি আমাদের মঞ্চকে। যেগুলো করেছে সেগুলো এখন উদাহরণ হিসেবে কাজ করছে। আমরা আশা করেছিলাম আরো অনেক কিছু দেবে আমাদের। এখন মন্ত্রী হয়েছে। এটা অনেক সাফল্য কিন্তু শিল্পের দায় তো পূরণ করেনি। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দেশব্যাপী যে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেখানে ফয়েজ আহমেদ ও রামেন্দু মজুমদারের পাশাপাশি নূর ভাইয়ের নাম থাকবে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
নূর ভাইয়ের সঙ্গে আমার সবসময় যোগাযোগ আছে। যখন মন্ত্রী ছিল না, বিরোধী দলে ছিল তখনো, এখন মন্ত্রী আছে তাই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। নূর ভাই ব্যবসার কাজে, রাজনৈতিক কাজে বাইরে গেলে বলত আমার নম্বর এই, এখানে আমাকে পাবি। সে কখনো আন্দোলন থেকে দূরে ছিল না। এটা কিন্তু সব মানুষের মধ্যে থাকে না। প্রথম দেখা আড্ডা দেয়া নূর এখনো একইরকম আছে, একটুও বদলে যায়নি।
তার বাসায় আড্ডা হয়। এখন একটু ব্যস্ত হয়ে গেছে, এটা স্বাভাবিক। তবে অনেক জায়গার আড্ডা এখন মিস করি। তবে আড্ডায় নূর ভাই বলে, আমার মন্ত্রণালয়ে আর কী কী করা যায়? এটা আর কোনো মন্ত্রীর মধ্যে দেখি না। অনেক কথা বলেছি, হয়তো সবটা রাখা সম্ভব হয়নি। ব্যক্তিগত সফলতা, রাগ-অনুরাগ অনেক কিছুই আলোচনা হয়। নূর ভাই আবৃত্তি করে। যে বাসায় হোক না কেন আবৃত্তি থাকে। নূর ভাই বড়মাপের মানুষ। গণমানুষের শিল্পী। ভেতরে ভেতরে অনেক মাটির মানুষ এটা কিন্তু তাকে দেখে বোঝা যায় না।
আমার স্ত্রী শিমুলের সঙ্গে আমার আগে থেকে পরিচয় নূর ভাইয়ের। শিমুল তখন শিশুশিল্পী। মজার ব্যাপার হলো বিচিত্রায় ’৭৪ সালে একটা কাভার স্টোরি হয়েছিল সেটায় নূর ভাই আর শিমুল ছিল। শাহাদত চৌধুরী করেছিলেন। পারিবারিক বন্ধন ছিল তখন থেকেই। আমার কন্যা-স্ত্রীর সঙ্গে তাদের ভালো সম্পর্ক। অভিযোগ আছে নূর ভাই নাটকে দশ বছর ধরে নেই। নূর ভাই আজীবন যেমন আছে, এমনই যেন থাকে।

 

পাঠকের মন্তব্য

Top