আমার বাবা একজন ফেমিনিস্ট | The Daily Star
০৪:০৪ অপরাহ্ন, আগস্ট ২৭, ২০১৬ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৫:২১ অপরাহ্ন, আগস্ট ২৭, ২০১৬

আমার বাবা একজন ফেমিনিস্ট

Share this with

Copy this link
সুপ্রভা তাসনিম

আসাদুজ্জামান নূরের দুই সন্তানের মধ্যে ছোট হচ্ছে মেয়ে। তার নাম সুপ্রভা তাসনিম। লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্স থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন তিনি। বর্ণিল জীবনের অধিকারী বাবাকে নিয়ে নিজের অনুভূতি পাঠকদের জন্য শেয়ার করেছেন সুপ্রভা

 

রাফি হোসেন : তুমি তোমার বাবাকে কীভাবে বর্ণনা করতে চাও?
সুপ্রভা : আমাদের বাসায় ছেলে-মেয়ে বলে কোনো পার্থক্য ছিল না। বাবা ছোটবেলাতে আমাকে এবং আমার ভাইকে একই সঙ্গে কারাতে ক্লাসে পাঠিয়েছিলেন। তার চিন্তা ছিল যে আমার ছেলে এবং মেয়ে দুজনেই শিখবে কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হয়, কীভাবে নিজেকে আরো শক্তিশালী করে তোলা যায়। আমাদের দুজনকেই আর্ট ক্লাসে ভর্তি করিয়েছিলেন, যদিও দুজনের একজনও আর্টের কিছুই পারিনি। অনেক সময় মেয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময়ও একটু ভিন্নভাবে বলা হয়, কিন্তু আমার বাবা তা করেননি। এটা আমার খুবই ভালো লাগে। আমার বাসায় আমি কখনো এমনটা পাইনি যে ছেলে বলে সে সবার সঙ্গে ফুটবল খেলবে আর মেয়ে বলে সে বাসায় বসে হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে খেলবে। আমার দাদী একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। বাবা তার জীবনে দাদীর মতো এমন অনেক নারীকে দেখেছেন, যারা নারীর অধিকারে বিশ্বাস করেন এবং যাদের প্রতি বাবার অগাধ শ্রদ্ধা। হয়তো সেই কারণেই বাবা আমাকেও সেভাবেই বড় করতে চেয়েছেন। এটা শুধু যে আমার ক্ষেত্রে তা নয়। আমার বয়স যখন দশ বছর তখন মায়ের একটি সুযোগ আসে লন্ডনে একটি কোর্স করার। মা প্রথমে যেতে চাননি। তিনি ভেবেছিলেন যে আমি এত ছোট আর দাদাও তখন পনের বছরের। কিন্তু বাবা প্রথম থেকেই বলেছিলেন তোমার অবশ্যই যাওয়া উচিত। বাবা এভাবেই আমাদের সবসময় উৎসাহ জুগিয়েছেন। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে দেখেছি, তাদের বাবা-মা তাদের বলতেন, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে। আমার ক্ষেত্রে এমন হয়নি। আমার এখনো মনে পড়ে, আমি যখন ও-লেভেলে সাবজেক্ট নির্ধারণ করতে গেলাম, তখন তাদের কাছে জানতে চেয়েছি আমি কী নেব? কিন্তু তখনো তারা কিছু বলেননি। বাবা বলেছিলেন, ‘তোমার যেটা ভালো লাগে তুমি সেটাই নাও। তুমি এখন থেকে যদি বাবা-মা যেটা বলে সেটা করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে যাও, তাহলে সারা জীবনই সেটা করবে।’ আমাদের স্বাধীনতাকে বাবা সব সময়ই প্রাধান্য  দিয়ে থাকে। আমি যখন  লন্ডনে ভর্তি হলাম, তখনও বাবা আমাকে বাধা দেননি। তিনি আমাকে নির্ভয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘ও একা থাকলেই বরং আত্মনির্ভরশীল হতে শিখবে।’ আমার বাবা নারী অধিকারে বিশ্বাসী। আমার বাসায় একবার একজন এসে অবাক হয়ে গিয়েছিল। আমার মা কাজে চলে গিয়েছিল আর আমিও স্কুলে যাচ্ছিলাম। বাবা নিজেই তার সকালের নাশতা তৈরি করছিলেন। বাসায় আসা ব্যক্তি অবাক হয়ে দেখছিলেন, এমন একজন মানুষকে তার স্ত্রী বা মেয়ে কেউই যতœ নিচ্ছে না। নিজেই নিজের খাবার, চা বানিয়ে খাচ্ছে। আমরা এ ঘটনা নিয়ে প্রায়ই নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করি কারণ বাবা নিজের কাজ নিজেই করতে পছন্দ করেন। আমাকে ঘরোয়া হতে হবে এমন কোনো চাপ বাসায় কখনো ছিল না। আমার ক্যারিয়ারের কথা বললে বাসা থেকে একটাই কথা ছিল তা হলো, তোমার অবশ্যই একটি ক্যারিয়ার থাকতে হবে। কিন্তু সেটা কোন সেক্টরে হবে তা নিয়ে কোনো চাপ নেই। চাপ শুধু এটাই, আমার নিজস্ব একটি ক্যারিয়ার থাকতে হবে। এখন অনেক সময় অনেক পার্টি বা অনুষ্ঠানে গেলে অনেকে বাবাকে বলেন, মেয়ের বিয়ে দেবেন না। অনেক সময় এড়িয়ে যান এই প্রশ্ন আবার অনেক সময় বাবার উত্তর থাকে ‘ও তো আমার সম্পত্তি না যে আমি ওর বিয়ে দিয়ে দেব। ওর জীবন ও বুঝে নেবে।’ এই সমর্থনটি পরিবার থেকে অনেক বেশি প্রয়োজন।



রাফি হোসেন : তোমার বাবার তো অনেক বর্ণিল জীবন। তার কোন দিকটি তুমি অনুসরণ কর বা অনুকরণীয় বলে মনে কর?
সুপ্রভা : আমি যখন বাইরে ছিলাম তখন সুযোগ পেলেই বাবা আর আমি অনেক ঘুরতাম। তার সঙ্গে অনেক নাটক দেখতাম। বাবার এই সাংস্কৃতিক দিকটা আমি খুব উপভোগ করি। বাবা সবসময় খুঁজে খুঁজে বের করে যে এখানে নাটকটা খুব ভালো, এখানে আর্ট এক্সিবিশনটি ভালো, এই বুক শপে ভালো বই আছে। বাবার কাছ থেকে এই সাংস্কৃতিক উৎসাহটা আমি পাই। বাবার সঙ্গে আমার সাধারণত ব্যবসা বা রাজনীতি নিয়ে কথা হয় না। তার সঙ্গে আমার কথায় থাকে নাটক, গান, বই এসব। বাবার প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে এই জিনিসগুলোও জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে।


রাফি হোসেন : তুমি কি রাজনীতিতে আগ্রহী?
সুপ্রভা : আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছি। সুতরাং পাঠ্য দিক থেকে ধরলে আমি রাজনীতিতে আগ্রহী। কিন্তু বাস্তব জীবনে রাজনীতিতে আমি অংশগ্রহণ করিনি, হয়তো করতেও চাই না।
রাফি হোসেন : বাবা সম্পর্কে আর কিছু?
সুপ্রভা : বাবার কাছ থেকে আমি আরেকটি জিনিস পেয়েছি, আর তা হলো জীবজন্তুর প্রতি ভালোবাসা। বল্টু আমাদের প্রথম পোষা কুকুর। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বাবা আমাদের শিখিয়েছেন পশু-পাখিদের খাওয়াতে, তাদের কষ্ট না দিতে। এটা আমি মনে করি বাবার কাছ থেকে পাওয়া অনেক ভালো একটি জিনিস। পরিবারে বাবা থাকেন কর্তা হিসেবে, তার প্রতি সবার একটা ভিন্ন রকমের সম্মান থাকে। আমাদের ক্ষেত্রে এটা একটু অন্যরকম। তিনি পরিবারের কর্তা এবং সম্মানও পান কিন্তু সেটা ঠিক কঠিন অর্থে না। তিনি আমাদের কাছে অনেক বেশি বন্ধুসুলভ। বাবাকে এটা বলা উচিত বা এটা বলা উচিত না এটা আমরা কখনো ভাবি না। তার সঙ্গে সবসময় বন্ধু হিসেবে জীবনের সব খুঁটিনাটি বিষয় শেয়ার করি।

 

পাঠকের মন্তব্য

Top