০৩:১৯ অপরাহ্ন, আগস্ট ২২, ২০১৬ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৩:২১ অপরাহ্ন, আগস্ট ২২, ২০১৬

জঙ্গি হামলা পথে নামিয়েছে হোলে আর্টিজান রেস্তোরাঁর কর্মচারী শিশিরকে

Share this with

Copy this link
রাফিউল ইসলাম

হোলে আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সহকারী বাবুর্চির কাজ যখন করতেন, শিশির বৈরাগীর রোজগার তখন ভালই ছিল। কিন্তু ঐ রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর বেকার হয়ে পড়েন তিনি। বর্তমানে গুলশান-২ এর ফুটপাথে টুথব্রাশ বিক্রি করেন শিশির। ইনসেটে তাঁর সাত বছর বয়সী ছেলে শান্তকে দেখা যাচ্ছে। শান্ত কিডনীর অসুখে ভুগছে। তার চিকিৎসার খরচও জোগাড় করতে হচ্ছে শিশিরকে। ফটোঃ এস কে এনামুল হক।

এক মাস আগেও সবকিছু ভালই চলছিল শিশির বৈরাগীর। একটা চাকরি করছিলেন, বেতন যা পেতেন সেই টাকায় তিন সদস্যের পরিবারের খরচ আর তার ছেলের কিডনির অসুখের চিকিৎসা ব্যয় মিটে যেত।

তারপর এক রাতে ওলট পালট হয়ে গেল শিশিরের পৃথিবী।

হোলে আর্টিজান বেকারীর সহকারী বাবুর্চি শিশির জুলাই ১ এর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় বেঁচে যান। কিন্তু সেই রাতের বিভীষিকার চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ভুগছেন তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে।

“আমার ছেলের কি হবে? জানিনা কিভাবে তার চিকিৎসার খরচ জোগাড় করব”- শিশির ডেইলি স্টারকে বলেন।

নয় মাস আগে তাঁর ছেলে সাত বছর বয়সী শান্ত’র কিডনির সমস্যা ধরা পড়ে। শান্ত প্রথম শ্রেণীতে পড়ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকরা তখন শিশিরকে বলেছিলেন তিন বছর সঠিক চিকিৎসা করালে শান্ত পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে উঠবে।

এখন পর্যন্ত ছেলে শান্ত’র চিকিৎসায় ১.৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে তাঁর।

প্রতি দুই মাসে তার চিকিৎসার জন্য ২৫,০০০ টাকা প্রয়োজন হয়।

বেকার শিশির, গুলশান হামলার আগে প্রতি মাসে ২৫,০০০ টাকা পেতেন।

হামলার রাতে জঙ্গিরা শিশির সহ রেস্তোরাঁর কয়েকজন কর্মচারীকে বাথরুমে আটকে রাখে। শিশির জানান একজন হামলাকারী তখন তাদের বলেছিল- “স্বর্গে আমাদের দেখা হবে।”

“ঐ জঙ্গিরা স্বর্গে গেছে কিনা তা জানিনা, কিন্তু তারা আমাদের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে।”

বরিশালের আগাইলঝড়া গ্রামে মাছ চাষের ব্যবসা ছিল শিশিরের। ব্যবসায় ব্যর্থ হবার পর তিনি ৪ লক্ষ টাকার বেশি ঋণের বোঝা নিয়ে ঢাকায় আসেন।

হোলে আর্টিজান রেস্তোরাঁর কাজে যোগ দেয়ার পর তাঁর সুদিন আসে। দেড় বছর আগে থেকে তিনি ঋণ পরিশোধ করতে শুরু করেছিলেন। ঐ জঙ্গি হামলার পর আবার পথে নেমে এসেছেন শিশির।

তিন এখন ফুটপাথে টুথব্রাশ বিক্রি করেন। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০টি ব্রাশ বিক্রি করে তাঁর ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লাভ হয়। শিশির জানান তিন বেলা খাবার যোগাড় করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে আর ছেলের চিকিৎসা খরচের কথা তিনি কল্পনাও করতে পারছেন না।

জঙ্গি হামলার পর কমপক্ষে ১০০টি রেস্তোরাঁয় চাকরির সন্ধানে গেছেন শিশির। ‘ব্যবসা ভাল চলছেনা’ বলে সবাই তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে।

এই সংবাদদাতা গতকাল ভাটারা এলাকায় তাঁর টিন-শেড ঘরটি দেখতে যান। শিশির তাঁর এক আত্নীয়র সাথে ঘরটি ভাগাভাগি করে বসবাস করেন। ৫,৫০০টাকা প্রতি মাসে ভাড়া বাবদ দেন তিনি।

জঙ্গি হামলার কয়েকদিন পর ১১ জুলাই শিশিরের স্ত্রী স্মৃতি বৈরাগী শান্তকে নিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন তার চিকিৎসার জন্য।

স্মৃতি বলেন স্বামী চাকরি হারাবার পর থেকে ভাল মত ঘুমোতেও পারছেননা তিনি।

“আগে ছেলের চিকিৎসার জন্য টাকা ধার দিত লোকজন। কারণ তারা জানতো যে আমার স্বামীর ভাল একটা চাকরি আছে। কিন্তু এখন আর ঐ পরিস্থিতি নেই।”

১ জুলাইয়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর শিশিরের সহকর্মীদের অনেকেই ঢাকা ছেড়ে চলে গেছেন।

কিন্তু ভূমিহীন শিশির থেকে যান। তাঁর বিশ্বাস অবস্থার উন্নতি ঘটবে এবং একটা ভাল চাকরি পাবেন তিনি।

কিন্তু ততদিন পর্যন্ত তিনি কিভাবে জীবন কাটাবেন সেটাই একটা বড় প্রশ্ন।

পাঠকের মন্তব্য

Top