জঙ্গির জবানবন্দি: কিভাবে আনসার আল ইসলাম ধার্মিক তরুণদের জঙ্গি বানিয়ে ফেলে | The Daily Star
০৮:০১ অপরাহ্ন, আগস্ট ২১, ২০১৬ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৮:০৩ অপরাহ্ন, আগস্ট ২১, ২০১৬

জঙ্গির জবানবন্দি: কিভাবে আনসার আল ইসলাম ধার্মিক তরুণদের জঙ্গি বানিয়ে ফেলে

Share this with

Copy this link
জায়েদুল আহসান

এখন পর্যন্ত যেসব জঙ্গি ধরা পড়েছে তাদের অধিকাংশই বয়সে সদ্য কিশোর পার করা তরুণ। তাদের নেতৃত্বের প্রথম ধাপে আছেন তাত্ত্বিক নেতারা, দ্বিতীয় ধাপে কথিত সামরিক কমান্ডার এবং তৃতীয় ধাপে আছেন পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ের জঙ্গিরা। এই বাস্তবায়কারী অর্থাৎ তৃতীয় সারির জঙ্গিই বেশ কজন ধরা পড়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের কাউকেই ধরা যায়নি। আল কায়েদা এবং আইএস এর ম্যানুয়ালে যেভাবে সদস্য রিক্রুট করার কথা বলা আছে এদেশেও তাদের এফিলিয়েটেড আনসার আল ইসলাম যা আগে আনসারউল্লাহ বাংলা টিম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল এবং কথিত আইএস এর বাংলাদেশ শাখা তা-ই অনুসরণ করে। গোয়েন্দাদের কাছে এসব জঙ্গি সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ঠিক কত তার হিসেবও নেই।

আনসার আল ইসলামের রিক্রুট করা এক জঙ্গির জবানবন্দিতে উঠে এসেছে তিনি কিভাবে জঙ্গি হলেন ও কিভাবে প্রশিক্ষণ নিলেন। তার নাম সুমন হোসেন পাটোয়ারি। আনসার আল ইসলাম তাকে রিক্রুট করে। তাকে শুদ্ধস্বর প্রকাশনার কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলকে হত্যার মিশনে পাঠানো হয়েছিল । গত বছর ৩১ অক্টোবর লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে ঢুকে টুটুলকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সে সময় তাঁর সঙ্গে থাকা আরও দুজনও আহত হন। তারা তিনজনই বেঁচে যান। তবে একই দিনে আনসার আল ইসলামের আরেকটি সেল শাহবাগের জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ের কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ দুটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে লেখক অভিজিৎ রায়ের কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে, যিনি নিজেও গত বছর ফেব্রুয়ারিতে একইভাবে খুন হন। ওই দুটি সেলের কেউ কাউকে চিনতে ও জানতে পারেনি।

জঙ্গি সুমন সংগঠনের কার্যক্রমে কখনো সিহাব কখনো সাকিব কখনো সাইফুল নাম ব্যবহার করেন। তিনি জানান সংগঠনের এটাই নিয়ম, সবাই ছদ্ম নাম ব্যবহার করে। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, গত ১৯ ফ্রেব্রুয়ারি বাড্ডার সাতারকুলে জঙ্গিদের ‘সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ ও মোহম্মদপুরে ‘বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে’ হানা দিয়ে তারা দুই জঙ্গি আটক করেন। তাদের দেওয়া তথ্যে ১৯ বছর বয়সী সুমনকে গত ১৫ জুন ঢাকার বিমানবন্দর থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ১৯ মে অন্য কয়েকজন জঙ্গির সাথে সুমনকেও ধরিয়ে দিতে দুই লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল পুলিশ।

এবার আমরা সুমনের জঙ্গি হয়ে উঠা এবং হত্যার মিশনে অংশ নেওয়ার বর্ণনাটি তার কথাতেই শুনি, যা আদালত ২১ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার অধীনে লিপিবদ্ধ করেছে।

জঙ্গিবাদের টোপে সুমন

সুমনের বাড়ি চাঁদপুরে হলেও বড় হয়েছেন চট্টগ্রামের হালিশহরে। সেখানেই বাবা মা ভাই বোনের সঙ্গে থাকেন। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন গত বছর, পাস করতে পারেননি। এই তরুণ চট্রগ্রামের আন্দরকিল্লায় একটি মেডিকেল ইকুইপমেন্টের দোকানে সেলসম্যানের কাজ করতেন।

সুমন আদালতে বলেছেন, গত বছর জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে কোন একদিন হালিশহরে এ ব্লক বাস স্টান্ডের পাশে মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় কাওসার নামের একজনের সাথে পরিচয় হয়। যার হালিশহরে এ ব্লকে রিকশার হুট সেলাইর দোকান ছিল। কলেজে যাওয়া আসার পথে তার দোকানে আড্ডা দিতেন সুমন। কাওসার তাকে কোরআন হাদিসের কথা বলতেন। কিছুদিন পর কাওসারের দোকানে দাড়ি টুপি ও পাঞ্জাবি পরিহিত একজন লোকের সাথে সুমনের কোরান হাদিস নিয়ে কথা হয়। এভাবে কয়েকদিন যাওয়ার পর কাওসার মুদি দোকানি ইউসুফ নামের একজনের সাথে সুমনকে পরিচয় করিয়ে দেন। সুমন ইউসুফের দোকানেও যাতায়াত শুরু করেন এবং কোরআন হাদিস নিয়ে আলোচনা করেন। ইউসুফের দোকানে একদিন সেই পাঞ্জাবি পরিহিত লোকের সাথে সুমনের আবার দেখা হয়। তার নাম মাহবুব। কয়েকদিন পর মাহবুব সুমনকে ফোন করে এ ব্লকে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ডেকে নেয়। মসজিদে জোহরের নামাজ পড়ার পর মাহবুব মেহরাজ নামের আরেকজন সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর মেহরাজ সুমনের সাথে প্রায়ই জিহাদ বিষয়ে কথা বলতেন। মেহরাজ সুমনকে protectedtext.com এ একটি আইডি খুলে দেন। ওই আইডিতে প্রায়ই মেহরাজের সাথে সুমন চ্যাট বক্সে জিহাদ নিয়ে নানা আলোচনা করতে থাকেন। এভাবেই সুমনের মন-মানসিকতায় জিহাদ চলে আসে। হয়ে উঠেন জঙ্গি।

ফার্স্ট এস্যাইনমেন্ট

এরপর মাহবুব একদিন এ ব্লকের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে মাহমুদ নামের একজনের সাথে সুমনকে পরিচয় করিয়ে দেন। তার সাথে কোরান হাদিস ও জিহাদের বিষয়ে সুমনের কথা হয়। এক পর্যায়ে মাহমুদ সুমনকে কোথাও কিছুদিনের জন্য যেতে প্রস্তাব দিলে সুমন রাজী হন। মাহমুদ সুমনকে বলেন, এখন থেকে চেনা পরিচিতজনদের কথা ভুলে যেতে হবে। এমনকি তার সাথেও আর দেখা হবে না বলে জানিয়ে দেন। এরইমধ্যে ইউসুফ একদিন ফোন করে তার দোকানে যেতে বললে সুমন সেখানে যান। তখন আশরাফ নামের একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। আশরাফ সুমনের মোবাইল নম্বর নেন। এবং solo runner নামে একটি আইডি খুলে দেন। সেই আইডি থেকে আশরাফের সাথে চ্যাট করা শুরু করেন সুমন।

চট্রগ্রাম ত্যাগ

কিছুদিন পর আশরাফ চ্যাটের মাধ্যমে ম্যাসেজ দিয়ে সুমনকে টঙ্গির কলেজ গেইটের কাছে যাত্রী ছাউনিতে এসে ফোন দিতে বলেন। সুমন নির্দেশ মতে চট্রগ্রাম থেকে টঙ্গিতে এসে আশরাফকে ম্যাসেজ দিলে রায়হান নামের একজন তাকে রিসিভ করে। রায়হানের কথামতো সুমন তার মোবাইলের সিম ও ব্যাটারি ফেলে দেন। এরপর রায়হান টঙ্গির কলেজ গেইট এলাকার বর্ণমালা গলি দিয়ে হয়ে একটি বিল্ডিং এর নীচতলায় দুই রুমের একটি বাসায় নিয়ে যান সুমনকে । আগে থেকেই ওখানে দুজন উপস্থিত ছিলেন। কিছুক্ষণ পর আরো দুজন যোগ দেন। তাদের নাম আকাশ, তৈয়ব, আলম ও রাফি বলে সুমন জানতে পারেন।

প্রশিক্ষণ শুরু

ঐ বাসায় প্রায় তিন মাস অবস্থান করেন সুমন। ওখানে রায়হান কোরআন হাদিস পড়াতেন এবং শারিরীক ব্যায়াম করাতেন। শেষের দিকে রাজু নামের একজন তাদের চাপাতি চালানোর প্রশিক্ষণ দেন। তিনি আর্থিক যোগানের দিকটিও দেখতেন। ওখানে কারো বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করা নিষেধ ছিল। কিছুদিন পর রাফি, তৈয়ব, আলম ও রায়হান চলে যায়। এরপর তাহসিন, বাবর, ইয়াহিয়া ও সাব্বির নামে চারজন আসে। সুমনসহ তাদেরকে রাজু পিস্তল ও চাপাতি চালানোর প্রশিক্ষণ দেন। এরইমধ্যে একদিন সাকিব ও হাদির সাথে এক "বড় ভাই" ট্রেনিং সেন্টারে আসেন। তিনিই দলনেতা। তিনি বলেন, আল্লাহর জন্য জিহাদ করতে হবে। এবং নাস্তিকদের কতল করতে হবে। তিনি জানান তিনি সেনা কর্মকর্তা ছিলেন, জিহাদের জন্য সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি ঈশতিয়াক নামটি ব্যবহার করেন।

সুমনের প্রথম অপারেশন

সুমন জানায়, একদিন হাদি একজনের ছবি দেখিয়ে বলে এই নাস্তিক ইসলামের শত্রু, ইসলামের বিরুদ্ধে বই প্রকাশ করে। তাকে খতম করতে হবে। একে মারার জন্য আপনাদের আনা হয়েছে, এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। হাদী জানায় যাকে মারতে হবে তার নাম টুটুল। হাদী টুটুলের লালমাটিয়ার শুদ্ধস্বর প্রকাশনার ঠিকানা দেয়। অপারেশনের জন্য তাহসিনকে গ্রুপ নেতা করে দেয়। দায়িত্ব পাবার পর টুটুলের অফিসের চারপাশে ভালো করে রেকি করি। গত ৩১ অক্টোবর সকালে আমরা লালমাটিয়ায় যাই। তাহসিন, বাবর ইয়াহিয়া ও আমার ব্যাগে চাপাতি আর সাব্বিরের ব্যাগে পিস্তল ও চাপাতি ছিল। আমরা শুদ্ধস্বর অফিসের সামনে ও আশেপাশে সকাল থেকেই অবস্থান করি। টুটুল ওইদিন দুপুর ১২ টার পর শুদ্ধস্বরে আসে। এর কিছুক্ষণ পর সাকিব আমাদের কাছে আসলে তাকে জানাই টুটুল অফিসে ঢুকেছে। তখন সাকিব যাও বলে নির্দেশ দিয়ে চলে যায়। ঐদিন আনুমানিক দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে আমরা টুটুলের অফিসে ঢুকি। দারোয়ানকে পিস্তল ঠেকিয়ে রুমে ঢুকে চাপাতি দিয়ে ভিতরের লোকদের কোপাতে শুরু করি। সাব্বির পিস্তল দিয়ে একজনকে গুলি করে। আমি টুটুলকে চিনতে পেরে চাপাতি দিয়ে কোপ দেই। কোপগুলো টুটুলের হাতে লাগে। দারোয়ান ছাড়া রুমের ভিতর থাকা টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে ও গুলি করে রাস্তায় এসে যে যার মত আলাদা হয়ে টঙ্গীর বাসায় আবার মিলিত হই। এরপর যে যার মতো চলে যায়। আমি চট্রগ্রাম চলে যাই।

সদস্য সংগ্রহে আল কায়েদা বা আইএসএর ম্যানুয়াল অনুসরণ

সুমনের এই স্বিকারোক্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আল কায়েদার সদস্য সংগ্রহের ম্যানুয়ালে যেভাবে বলা আছে সুমনের ক্ষেত্রেও সেই সব ধাপ অনুসরণ করা হয়েছে। যেমন শুরুতে শুধু ইসলাম কোরআন ও হাদিস নিয়ে কথা বলা হয়েছে। এভাবে ধাপে ধাপে তিন জন তার সাথে কোরআন হাদিস নিয়ে কথা বলার পর চতুর্থজন এসে সুমনের সাথে জিহাদ নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। এরপর ক্রমানুসারে আরো দুজন অনলাইনে তাকে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করেন। পরের ধাপে তাকে শারিরীক প্রশিক্ষণ, চাপাতি চালানো এবং সবশেষে অস্ত্র চালানো শেখানো হয়। মান্যুয়াল অনুযায়ী সুমনকেও সবধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকতে বলা হয়ছিল।

চট্রগাম থেকে টঙ্গিতে এসে যে চারজনের সঙ্গে ফিজিক্যাল ট্রেনিং নেন তারা দৃশ্যপট থেকে উধাও হয়ে যায়। যোগদেন নতুন চারজন। যাদের সাথে চাপাতি ও পিস্তলের প্রশিক্ষণ নিয়ে সুমন হত্যার মিশনে অংশ নেন। টঙ্গি এসেই চট্রগ্রামের সাথে তার আর কোন যোগাযোগ থাকে না। শুধু চট্রগ্রামের গ্রুপই নয়, টঙ্গিতে শুরুতে যাদের সাথে প্রশিক্ষণ নিয়েছে তাদের সাথেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি জানুয়ারি মাসে জঙ্গিদের সংস্পর্শে আসেন, অক্টোবরেই হত্যার মিশনে নামেন। অর্থাৎ ১০ মাসের মধ্যেই তার মগজ ধোলাই হয়ে যায়। এই ১০ মাসে নেতাসহ ১৯ জঙ্গির নাম পাওয়া যায় জবানবন্দিতে। গোয়েন্দাদের ধারণা এই ১৯ জনের মধ্যে যিনি সেনাবাহিনী ছেড়ে চলে এসেছেন বলে দাবি করেছেন অর্থাৎ ঈশতিয়াক নাম ব্যবহারকারি ব্যক্তিটিই আনসার আল ইসলামের সামরিক কমাণ্ডার মেজর (বরখাস্ত) জিয়া। সেনা অভ্যুত্থান চেস্টায় যাকে ২০১২ সালে বরখাস্ত করা হয়।

এরপর কী

কারাবন্দি সুমনের এই জবানবন্দি অনুযায়ী আদালতে হয়তো তিনি দোষী সাব্যস্ত হবেন। তার বিরুদ্ধে যে হত্যা চেস্টা মামলা চলছে, দণ্ডবিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন দণ্ডিতই হবেন। কিন্তু কেন তিনি জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হলেন তা কি খতিয়ে দেখবে কেউ? সুমন যখন সাজা খাটা শেষ করে মুক্তি পাবেন তখন তার বয়স হবে সর্বোচ্চ ৪০। ৪০ বছরের যুবক সুমন তখন কী করবেন? কারাগারেতো কাউন্সিলিংয়ের সুযোগ নেই। মুক্তির পর রাষ্ট্র কি তার পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেবে? সে ধরনের কোন পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। নাকি আবার তিনি জিহাদে যুক্ত হবেন?

পাঠকের মন্তব্য

Top