কল্যাণপুরের জঙ্গিরা রেকর্ড করা বক্তব্যে পরিবার ও গণতন্ত্রের নিন্দা জানায় | The Daily Star
০৩:০১ অপরাহ্ন, আগস্ট ২২, ২০১৬ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৩:০৩ অপরাহ্ন, আগস্ট ২২, ২০১৬

কল্যাণপুরের জঙ্গিরা রেকর্ড করা বক্তব্যে পরিবার ও গণতন্ত্রের নিন্দা জানায়

Share this with

Copy this link
জায়েদুল আহসান

নিজেদের শেষ পরিণতির কথা জানতে পেরে, কল্যাণপুরের জঙ্গিরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের উপর আক্রমনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। কথিত ‘ইসলামিক স্টেট’-এর কালো পাঞ্জাবী পড়ে এবং নিজেদের পরিবার এবং “বিশ্বের মুসলমানদের” জন্য তাদের বক্তব্য রেকর্ড করে রাখে।

সেই ধারণকৃত বক্তব্যে শোনা যায় দুই সদ্য তরুণ জঙ্গি তাদের পরিবারের উদ্দেশ্যে বলে "তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও, আর ইসলামের পথে অগ্রসর হও" | তাদের মস্তিস্কের বৈকল্য এমনই হয়েছে যে এদের একজন তার পরিবারের নিন্দা করে বলে "তোমরা সবাই মুরতাদ কারণ তোমরা সবাই গণতন্ত্রকে সমর্থন করো, তোমরা দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সমর্থন করো |"

তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তাদের কতো গভীরভাবে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা শেখানো হয়েছে এবং তাদের মতবাদকে কিভাবে হিংসা আর সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তাদের পরিবারের প্রতিও তীব্র ঘৃণা দিয়ে ভরা হয়েছে, তাদের বাবা-মাও যে ইসলামের প্রকৃত সমর্থক নয় সেকথা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে তারা রেকর্ড করে গেছে।

এই লেখক নয়জন জঙ্গির মধ্যে তিনজনের রেকর্ডকৃত বক্তব্য সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করে দেখেছে এদের মধ্যে জুবায়ের হোসেন বাংলায় এবং , শেজাদ রউফ অর্ক আর তাজ উল হক রাশিক ইংরেজিতে বক্তব্য রেকর্ড করেছে। মাঝে মাঝে তারা কোরআনের আয়াতও উচ্চারণ করেছে।

অপারেশন স্টর্ম ২৬ সফল পরিচালনার পর পুলিশ বাড়িটিতে তল্লাশী চালিয়ে কিছূ নস্ট করে ফেলা ল্যাপটপ পেনড্রাইভ উদ্ধার করে। তাতে শুধু অডিও রেকর্ডই নয়, একটি ভিডিওচিত্রও পাওয়া যায়। যেখানে কিছু কাগজপত্র পোড়াতে দেখা গেছে। অপারেশন শুরুর আগে পুলিশ যখন বাড়িটি ঘিরে রেখেছিল তখনই তারা একসাথে কালো পাঞ্জাবি পরে তৈরী হয়ে ছবি তুলে। এবং কাগজপত্র ও ডিভাইসগুলো পুড়িয়ে ফেলে।

তারা বেশ কয়েকটি ফোন নম্বর, ল্যাপটপ আর পেনড্রাইভ ব্যবহার করতো তাদের বক্তব্য আর ছবি রাখার জন্য | ধারণা করা হচ্ছে, কন্টেন্টগুলো মেসেঞ্জারের মাধ্যমে নানান জায়গায় পাঠানোর জন্যই এই যন্ত্রগুলো রাখা হয়েছিল। যদিও, গোয়েন্দারা শেষ পর্যন্ত ডিভাইসগুলো থেকে তাদের বক্তব্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে |

ওই তিনজনের একজন সামরিক অস্ত্র ব্যবসায়ী তৌহিদ রউফের পুত্র, শেজাদ রউফ অর্ক মার্কিন নাগরিক | তার দাদা সাবেক সামরিক গোয়েন্দা প্রধান | সে ২০০৯ সালে বাংলাদেশে ফেরত আসে, এবং নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ তে অধ্যয়নরত ছিল | সে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থাকতো |

তার বক্তব্যের অনেকটা অংশ পরিবারের বিরুদ্ধে, তার বাবা তৌহিদ রউফ এবং পরিবারের সবাই যারা 'শেখ হাসিনাকে' সমর্থন করে, আর শরীয়াতের বিধান সমর্থন করে না | সে বলেছে, সে সব কিছু ত্যাগ করেছে জিহাদের জন্য, এবং কোরানের আয়াত দিয়ে নিজের কাজকে সঠিক প্রমানের চেষ্টা করে বলেছে "তুমি মরবে, নাহলে মারবে, জান্নাত আমাদের জন্য |"

"তোমরা শেখ হাসিনাকে সমর্থন করো, তোমরা গণতন্ত্র সমর্থন করো.. তাই আমি আমার পরিবারের সবাইকে মুরতাদ বললাম.. তোমরা সবাই কাফের | তোমরা অনুতপ্ত হও, দেরি হয়ে যাবার আগে তোমরা অনুতপ্ত হও" -- বলেছে অর্ক |

তাদের অবস্থানটি যখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ঘিরে রেখেছে, কয়েকবার চেস্টা করেও যখন ভেতর থেকে পালানোর পথ পাচ্ছিল না সেই চিত্র বিবেচনায় নিয়ে অর্ক বলে “আমরা এই মুহুর্তে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত, পুলিশ হোক আর র‌্যাব হোক যারা প্রথমে আক্রমণ করবে আমরা তাদের হত্যা করব, আমরা আল্লাহর কাছ থেকে নির্দেশ পেয়েছি, আমরা তোমাদের হারাবো " ইংরেজিতে এ বক্তব্য ধারন করে অর্ক |

অর্কের এ কথার সময় কিছু আওয়াজ শোনা যাচ্ছিলো| আওয়াজে মনে হয়েছে সেগুলো ধাতব বস্তু (সম্ভবত অস্ত্র)। তিন জঙ্গির আরেকজন তাজ উল হক রাশিক। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিকাল এন্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছে। সে ধানমন্ডির বাসিন্দা রবিউল হকের ছোট ছেলে | রাশিক একাডেমিয়া থেকে ও'লেভেল আর মাস্টারমাইন্ড স্কুল থেকে এ' লেভেল পাস্ করে |

তার দুই মিনিটের বক্তব্যে জিহাদকে সমর্থন করে জনগণের স্বার্থে বলে "তোমরা সবাই খিলাফতে যোগদান করো", সাধারণ জনগণকে কাফের অভিহিত করে সে বলে 'এটা শুরু মাত্র, দেখতেই তো পাচ্ছ তোমাদের দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে ... এই বার্তা তোমাদের ভাই তাজ উল হকের ... আল্লাহ যেন আমাকে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করেন' |

তৃতীয় যে জঙ্গির বক্তব্য পাওয়া গেছে তার নাম জুবায়ের হোসেন। সে নোয়াখালী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল | সে দুই মাস নিখোঁজ থাকার পরে, তার বাবা আব্দুল কাইয়ুম জুলাই মাসে সুধারাম মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে|আব্দুল কাইয়ুম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তার পুত্র ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মী ছিল।

জুবায়ের তার বক্তব্যে আইএস এর প্রধান আবু বকর আল বাগদাদিকে উদ্দেশ্য করে বলে 'সেই সকল পাপীদের চোখ তুলে নাও যারা তাদের কঠিন দৃশ্য দিয়ে প্রকৃত মুসলমানদের ভয় দেখায়।'

সে তার পরিবারের উদ্দেশ্যে বলে 'তোমরা ধর্মের পথে এসো' । যে তার মা বাবাকে ইসলামের পথ দেখাবে তাকেই সে পছন্দ করবে বলে সে বক্তব্যে উল্লেখ করে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম মনে করেন জঙ্গিদের মাস্টারমা্ইন্ডরা নতুন করে কারো মগজ ধোলাই করতে এই ভিডিও ও অডিওগুলোকে অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহারএর চেষ্টা করতেও পারে। ধারনকৃত এসব ছবি ও অডিও-ভিডিও তৈরি করে দেশের কয়েকটি জায়গায় পাঠানো হয়েছে বলে তার ধারনা। কাদের কাছে পাঠানো হয়েছে তার অনুসন্ধান চলছে বলে জানান তিনি।

আর একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, তার ধারনা, ওই আস্তানার একটি ভিডিওতে দেখা গেছে জঙ্গিরা কয়েকটি কাগজে আগুন দিচ্ছে। তখনই একজনকে বলতে শোনা যায়, “এই সব সার্টিফিকেটের কোনো দাম নেই। এই সার্টিফিকেট দিয়ে কেবল চাকর হওয়া যায়।”

পাঠকের মন্তব্য

Top